হস্তান্তরযোগ্য দলিলের ধারণা ও হস্তান্তরযোগ্য দলিলের বৈশিষ্ট্য


হস্তান্তরযোগ্য দলিলের ধারণা ও হস্তান্তরযোগ্য দলিলের বৈশিষ্ট্য।
 হস্তান্তরযোগ্য দলিলের ধারণা ও হস্তান্তরযোগ্য দলিলের বৈশিষ্ট্য

হস্তান্তরযোগ্য ঋণের দলিলের ধারণা ( Concept of Negotiable Instrument ) 

ক্রেতাদের কাছে বেশি পরিমাণে পণ্য বিক্রি , ক্রেতাদের সব সময় ধরে রাখা তথা বেশি মুনাফা অর্জনের জন্য ব্যবসায়ীদের বাকিতে বা ধারে লেনদেন করতে হয় । এই লেনদেন নিষ্পত্তিতে কাগজী মুদ্রার ঋণের পাশাপাশি হস্তান্তরযোগ্য দলিল ব্যবহৃত হয় । ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপ ও আমেরিকায় ব্যবসায়িক লেনদেন প্রসারিত হওয়ার পর হস্তান্তরযোগ্য দলিলের প্রচলন ঘটে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় । ব্যবসায়িক জগতে ধারে লেনদেনের ক্ষেত্রে দুটি পক্ষের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিপত্রটি হলো ঋণের দলিল । এই দলিলের মাধ্যমে একপক্ষ ধারে বা বাকিতে পণ্যদ্রব্য কেনে অথবা অর্থ ধার করে । যিনি বাকিতে কিনেন বা ধার নেন , তিনি একটি নির্দিষ্ট সময় পর নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধের অঙ্গীকার করেন । ফলে এই দলিলের মাধ্যমে ব্যবসায়িক জগতে লেনদেন আরও গতিশীল হয় । 

দলিলের স্বত্ব বা মালিকানা অর্পনকেই হস্তান্তর বলা হয় । অর্থাৎ একজন মালিক বা ধারক তার স্বত্ব অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরিত হওয়ার পর দ্বিতীয় ব্যক্তি ঐ দলিলটির ওপর অবাধে নিজের স্বত্ব আরোপ করে । এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া দেশের প্রচলিত ব্যবসায় আইন অনুযায়ী হয় । হস্তান্তরযোগ্য দলিলের উল্টোপিঠে অথবা তার সাথে সংযুক্ত চিঠায় ( Letter of acceptance ) হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে ধারক স্বাক্ষর করলেই এর মালিকানা হস্তান্তরিত হয় । 

দলিলের প্রকৃত মালিকই শুধু এই দলিলে স্বাক্ষর করতে পারেন । এই দলিলে অন্য পক্ষের দোষ - ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও ব্যবহারকারী যেকোনো ধারক তার ওপর মালিকানাস্বত্ব পায় । আধুনিক ব্যবসা - বাণিজ্যে বিভিন্ন ধরনের হস্তান্তরযোগ্য ঋণের দলিল প্রচলিত আছে । 

১৮৮১ সালে হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন ' - এ তিন ধরনের দলিলকে হস্তান্তরযোগ্য দলিল হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে । দলিলগুলো হলো- 

( i ) বিনিময় বিল 

( ii ) প্রতিশ্রুতি পত্র এবং 

( iii ) চেক । 

এছাড়াও আরও কয়েকটি দলিলকে ‘ ১৮৮২ সালের Transfer of Property Act -এর ১৩৭ নং ধারা অনুযায়ী ’ হস্তান্তরযোগ্য দলিলের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে । অর্থাৎ হস্তান্তরযোগ্য দলিল বলতে বোঝায় প্রস্তুতকারক কর্তৃক স্বাক্ষরিত এমন দলিল যা অবাধে হস্তান্তর হয়ে নগদ অর্থের মতোই আর্থিক লেনদেনে সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের দেনা - পাওনা নিষ্পত্তিতে ব্যবহৃত হয় । নগদ অর্থ না হওয়া সত্ত্বেও এসব দলিল শর্তসাপেক্ষে আর্থিক লেনদেনে অর্থ হিসেবে গ্রহণযোগ্য । ১৮৮১ সালের হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন অনুযায়ী এসব দলিল হস্তান্তরের সাথে সাথে এর মালিকানাও হস্তান্তরিত হয় ।


হস্তান্তরযোগ্য দলিলের বৈশিষ্ট্য ( Characteristics of Negotiable Instrument )

হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে যে ঋণপত্র তৈরি হয় তাকে হস্তান্তরযোগ্য দলিল বলে । হস্তান্তরযোগ্য দলিলের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এর মালিকানা বা স্বত্ব হস্তান্তর করা । নিচে হস্তান্তরযোগ্য দলিলের বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করা হলো →

লিখিত দলিল ( Written document ) : হস্তান্তরযোগ্য দলিলের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো এই দলিল অবশ্যই লিখিত হতে হয় । সাধারণত বিনিময় বিল পাওনাদার কর্তৃক , চেক ব্যাংক সরবরাহকৃত নির্দিষ্ট ছাপানো পাতার আমানতকারী কর্তৃক । ও অঙ্গীকারপত্র দেনাদার কর্তৃক লেখা হয় ।

যথাযথ পক্ষ কর্তৃক স্বাক্ষরিত ( Signed by the appropriate party ) : এরূপ দলিল অবশ্যই প্রস্তুতকারী বা তার প্রতিনিধি দিয়ে স্বাক্ষরিত হতে হয় । স্বাক্ষর ও তারিখ ছাড়া দলিলের কোনো আইনানুগ মূল্য থাকে না । →

নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের উল্লেখ ( Mentioning certain sum of money ) : এই দলিলে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়ার অঙ্গীকার থাকে ।

একাধিক পক্ষ ( Multiple parties ) : হস্তান্তরযোগ্য দলিলে একাধিক পক্ষ থাকে । অঙ্গীকার পত্রের দুটি পক্ষ যথা অঙ্গীকারদাতা ও অঙ্গীকারগ্রহীতা আর বিনিময় বিল ও চেকে তিনটি পক্ষ ( যথা : আদেষ্টা , আদিষ্ট ও প্রাপক ) থাকে ।

ঋণের প্রমাণ ( Proof of lean ) : সব রকমের হস্তান্তরযোগ্য দলিলই আদালত বা যেকোনো আইনসম্মত কর্তৃপক্ষের কাছে ঋণের প্রমাণ হিসেবে গণ্য ।

হস্তান্তরযোগ্যতা ( Transferability ) : এটি এক হাত থেকে অন্য হাতে হস্তান্তরিত হয় । অর্থাৎ হস্তান্তরযোগ্য দলিল অর্পণের মাধ্যমে নগদ অর্থের মতোই অনেকটা হস্তান্তরিত হয় । অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদন / পৃষ্ঠাঙ্কন করেও হস্তান্তরিত হয় ।

প্রাপকের নাম উল্লেখ থাকবে ( Mention the name of payee ) : যেকোনো ধরনের হস্তান্তরযোগ্য দলিলেই প্রাপকের নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন । অবশ্য তৃতীয় কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে বিনিময় বিলে বা চেকে আদেষ্টা নিজ বা Self শব্দটি উল্লেখ করতে পারে । এতে আদেষ্টা নিজেই প্রাপক হিসেবে গণ্য হবে । অঙ্গীকারপত্রের ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রাপকের নাম উল্লেখ করতে হবে । প্রাপকের স্বাক্ষরের পরই হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনগত দলিলে পরিণত হয় ।

প্রচলিত মুদ্রায় অর্থ পরিশোধ ( Payment by legal currency ) : সব ধরনের বিনিময়যোগ্য দলিলের পাওনা অর্থই দেশের প্রচলিত মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে । অবশ্য বৈদেশিক বিনিময় বিল বা ট্রাভেলার্স চেকের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রচলিত মুদ্রায় অর্থ পরিশোধযোগ্য হয় ।

চাওয়ামাত্র বা নির্দিষ্ট সময়ের পরে দেয় ( Payable on demand or after certain period ) : সব ধরনের হস্তান্তরযোগ্য দলিলই চাওয়ামাত্র প্রদেয় হতে পারে । তবে নির্দিষ্ট সময়ের পরেও পরিশোধের নির্দেশে বা অঙ্গীকারে বিনিময় বিল ও অঙ্গীকারপত্র প্রস্তুত করা যায় ।

মেয়াদ ( Maturity ) : বিনিময় বিল ও অঙ্গীকারপত্র সাধারণত বিভিন্ন মেয়াদের হয় এবং দলিলে তা লেখা থাকে । এসব দলিল চাওয়ামাত্র পরিশোধ্যও হতে পারে । চৈকও চাওয়ামাত্র পরিশোধ্য হয়ে থাকে ।

উপস্থাপন ( Presentation ) : মেয়াদপূর্তিতে অথবা যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে সব ধরনের হস্তান্তরযোগ্য দলিলই যথাযথ পক্ষের কাছে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করতে হয় ।


Related Keyword

হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন ১৩৮ ধারা

বিনিময়যোগ্য দলিল আইন ১৮৮১

হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন কত সালের

হস্তান্তরযোগ্য কি

হস্তান্তরযোগ্য ঋণের দলিল কি

অঙ্গীকারপত্র কি

হস্তান্তরযোগ্য দ্রব্য

নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট আইন ১৮৮১ PDF




ধন্যবাদ আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করার জন্য 







...

Previous Post Next Post