সমবায় সমিতির ধারণা এবং নীতিমালা ও উদ্দেশ্য।



সমবায় সমিতির ধারণা এবং নীতিমালা ও উদ্দেশ্য।
সমবায় সমিতির ধারণা এবং নীতিমালা ও উদ্দেশ্য





সমবায় সমিতির ধারণা ( Concept of Cooperative Society) 


সমবায়ের শাব্দিক অর্থ সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও উদ্যোগে কাজ করা। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন। এই কারণেই সকলের তরে সকলের আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে, একতাই বল, প্রতিযোগিতা নয় সম্প্রীতি নীতির উপর ভিত্তি করে সমবায় সমিতির উৎপত্তি হয়েছে। সমবায়ের মাধ্যমে লোকজন পরস্পরের সহযোগিতায় নিজেদের আর্থিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে পারে। এভাবে তারা সুন্দর ও সচ্ছল জীবন যাপন করতে পারে। 



সমাজের শোষক শ্রেণীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কিছু কম বৃত্তসম্পন্ন একই শ্রেণি ভুক্ত এবং সম্ভমনা ব্যক্তির সম অধিকারের ভিত্তিতে স্বেচ্ছায় সমবায় সমিতি গঠন করেন। মুনাফা অর্জন সমিতির মূল উদ্দেশ্য নয় সদস্যদের কল্যাণী এর মূল উদ্দেশ্য। সদস্যদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা লাভ করার জন্য এটি একটি যৌথ প্রচেষ্টা পারস্পারিক বিশ্বাস সততা সহযোগিতা ইত্যাদি আদর্শের ভিত্তিতে সমবায় সমিতি গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের সমবায় সমিতি ২০০১ সালের সমবায় আইন ২০০৪ সালের সমবায় বিধি অনুযায়ী গঠিত ও পরিচালিত হয়। এছাড়া প্রত্যেক সমিতির অভ্যন্তরে কাজ করছে না করে থাকে নিজস্ব উপবিধি। 



সমবায় সমিতির নীতিমালা 

নীতি বা আদর্শ হচ্ছে সুপ্রতিষ্ঠিত পথ নির্দেশনা। এর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে চলে। সমবায় হচ্ছে স্বল্প বৃত্ত সম্পন্ন ও সমমননা লোকদের স্বেচ্ছায় প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে লোকজন নিজেদের ভাগ্য করে তোলার সংগ্রামী নিয়োজিত হন। এই সংগ্রামে কতগুলো নীতি অনুসরণ করা জরুরীটি তা নিচে আলোচনা করা হলো :


একতা Unity: একথাই বল এই মূলত বাম মৌলিক নীতির উপর সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠিত দরিদ্র মানুষের পক্ষে বিচ্ছিন্নভাবে পুঁজি-প্রতিদের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তাই সমবায়ের সাফল্য ও লক্ষ্য অর্জন এবং নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে সদস্যদের একতাবদ্ধ হতে হয়। এই ঐক্যই তাদের মূল শক্তি। 


সাম্য Equality : সমবায় সমিতি সাম্যর নীতিতে বিশ্বাসী। সমবায়ের সব সদস্যই সমান মর্যাদার অধিকারী সমিতির কাজ পরিচালনা বা কোন অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে সকলের সমান বলে বিবেচিত হয়। এখানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, দল নির্বিশেষে সবাইকে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করতে হয়। 


সহযোগিতা Cooperation : প্রবাদে আছে দশের লাঠি, একের বোঝা বা দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ। অর্থাৎ সকলে মিলে যে কোন কাজ করার সহজ এককভাবে সমবায় সব কাজ গুছিয়ে করা সম্ভব নয়। তাই একে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। মনে রাখতে হবে সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরে পরের তরে। 


আরো পড়ুন : শিক্ষার্থীদের জন্য সেরা ৩টি সাইন্টিফিক ক্যালকুটার 


সততা Honesty : সত্যতা একটি মহৎ গুণ। সমবায় সমিতির সদস্য ও পরিচালকদের মধ্যে ব্যক্তিক পর্যায়ে থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা সব স্তরে গুণ থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। সততা অন্যায়ের নীতির সাথে সমিতির কাজ চালে যেতে হয় কথায় বলে হনিস্টি ইজ দ্যা বেস্ট পলিসি অর্থাৎ সততা সর্বকেষ্ট পন্থা। 


সঞ্চয় Savings : সমবায় সমিতি হলো সমাজের সাধারণ মানুষের সংগঠন। এর মাধ্যমে সাধারণ বঞ্চিত শোষিত নিপীড়িত মানুষ একতাবদ্ধ হন। তাদের আয় উপার্জন কম থাকে এজন্য তারা তাদের ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে একত্রিত করে মূলধন গঠন করেন। তাই সঞ্জয় সমবায়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নীতি। 


মিতব্যয়ীতা Economy : মিতব্য এটা বলতে দক্ষ কার্যকর ভাবে উপকরণ ও সম্পদের ব্যবহার করাকে বোঝায়। সমিতি পরিচালনায় খেয়াল রাখতে হয় যেন সম্পদের অপচয় না বা ব্যবহার অপব্যবহার না হয়। সমবায় হলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠান। তারা অতি কষ্ট সঞ্চয়ের মাধ্যমে এর মূলধন যোগ আনন্দ দিয়ে থাকেন। তাই সমিতির প্রতিটি পর্যায়ে সাশ্রয়ী হওয়ার মাধ্যমে মিলবে তার অনুসরণ না করলে এর উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব নয়। 


বন্ধুত্ব Friendship : বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারলে সমিতির লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। সদস্যদের মধ্যে বন্ধুত্ব করে উঠলে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্পর্কে একতার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর সহজ হয়। এতে অপরের বন্ধু হয়ে কাজ করতে পারেন। 



সমভোটাধিকার Equal voting right: সমবায় সমিতি হচ্ছে সাম্যের প্রতীক। অর্থাৎ এখানে সকল সমান যেসব যত সংখ্যক সেরা মালিকই হোক না কেন প্রত্যেকের ভোটাধিকার সমান। প্রত্যেকেই একটি মাত্র ভোট দেয়ার অধিকার রাখেন। সমবায় শেয়ার বেশি হওয়ার কারণে একাধিক ভোট দেওয়া যায় না। 



সমঝোতা Compromise : সাধারণত বেশি সংখ্যক ব্যক্তির সংগঠন হওয়ায় সমবায় সমিতির বিভিন্ন ব্যাপারে সদস্যদের মতাভেদ দেখা দিতে পারে। কিন্তু সফলভাবে সমবায় সমিতি টিকিয়ে রাখতে হলে এই সদস্যদের ব্যক্তিগত আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে সব বিষয়ে সমঝোতা আসতে হবে। 



সেবা Service : সামষ্টিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া ও তাদের কল্যাণের সব ধরনের প্রচেষ্টায় সেবা। তাই সকল সদস্যদের যেন সমান সেবা পেতে পারেন সে দিকে প্রত্যেকে সদস্যকে খেয়াল রাখতে হবে। মোরা পাওয়ার যোগান করার সমিতির একমাত্র উদ্দেশ্য নয় বরং সেবায় সমিতির মুখ্য উদ্দেশ্য এই কথাটি সমিতির প্রচলনায় সব সময় মেনে রাখতে হবে। 


আস্থা ও বিশ্বাস : সমিতির সদস্যদের মধ্যে পারস্পারিক অবস্থা ও বিশ্বাস থাকা একান্তই প্রয়োজন। অন্যথায় সমিতি পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কথায় বলে যেখানে সন্দেহ সেখানে দন্ড তাই সাধারণ সদস্যদের থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদের সব পর্যায়ের চূড়ান্ত আস্থা ও বিশ্বাস বজায় রাখতে হয়। 


মুনাফা বন্টন ও সঞ্চিতি সংরক্ষণ : মুনাফা অর্জন সমিতির উদ্দেশ্য নয়। তবে এর কাজের মধ্যে দিয়ে মুনাফা হয়ে থাকে।সমিতির মোনাফা থেকে বাধ্যতামূলকভাবে কমপক্ষে ১৫% সঞ্চিত হবে এবং ৩ % সমবায় উন্নয়ন তহবিল জমা রাখতে হয়। বাকি অংশ শেয়ার অনুপাতে সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। 



গণতন্ত্র Democracy: সমবায় সমিতি একটি গণতান্ত্রিক কৃতি সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান। এজন্য গণতন্ত্রের নীতি সদস্যদের দৃঢ় থাকতে হয়। প্রতিষ্ঠান পড়ছো না খেতে সকলের অধিকার সমান। স্বেচ্ছাচারিত কোন সুযোগ নেই এখানে নেই। অধিকাংশ সদস্যদের মতের ভিত্তিতে সমৃদ্ধির সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়। প্রত্যেকের পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ অধিকারী থাকতে হয়।



সহনশীলতা Tolerance : সহনশীলতা বলতে অপরের প্রতি নমনীয় হওয়াকে বোঝায়। সদস্যদের একে অন্যের প্রতি সহনশীল আচরণ দেখাতে হবে। এতে নিজেদের মধ্যে বিবাদ কমে যাবে এবং আস্থাও বন্ধুত্বের ১৬ পরিবেশ বজায় থাকবে। 


আরো পড়ুন : নির্দেশনার গুরুত্ব 


স্বাধীনতা Independence : সমবায় সমিতির সদস্যদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া উচিত। সমিতিতে যোগদান সমিত থেকে অব্যাহতি নেওয়া বা চলে যাওয়া মত প্রকাশ প্রভৃতি ক্ষেত্রে সদস্যদের স্বাধীনতা বহাল রাখা জরুরী। অন্যথায় সমবায় মূল উদ্দেশ্য বাধা প্রাপ্ত হবে। 


নৈকট্য Proximity : সুষ্ঠু ও সফলভাবে সমবায়ের কাজ পরিচালনা করতে হলে এর সদস্যদের মধ্যেও নৈকট্য বজায় রাখা প্রয়োজন। এজন্য এরূপ সংগঠনের সদস্যগণ সাধারণত একই ধরনের মানসিকতাসম্পন্ন হয়ে থাকেন। এতে সমিতির কাজগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করা সহজ হয়। 



সমবায় সমিতির উদ্দেশ্য 


সাধারণত নিম্নবিত্ত দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ নিজেদের টিকিয়ে রাখা বা অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদের সমবায় সমিতি গড়ে তোলেন। মোরা উপার্জন করা এর মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। সদস্যদের আর্থিক সমস্যা দূর করে সচ্ছলতা নিয়ে আসা এই তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করাই সমবায় সমিতির মুখ্য উদ্দেশ্য। সম্মতির উদ্দেশ্য গুলি বর্ণনা করা হলো :-


• আর্থিক কল্যাণ। 

• পুঁজি গঠন। 

• সম্পদের সুষম বন্টন। 

• সংগঠিত হওয়া। 

• কর্মোদ্যম সৃষ্টি। 

• আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন। 

• শোষণ থেকে রক্ষা। 

• সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা। 

• কর্মসংস্থান সৃষ্টি। 

• সহযোগিতার উন্নয়ন। 

• নৈতিকতার উন্নয়ন। 

• সামাজিক সমস্যার মোকাবেলা। 

• ন্যায্য মূল্যের পণ্য সামগ্রী সরবরাহ। 

• কৃষি উৎপাদনের সহায়তা। 

• ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নয়ন। 

• জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। 

• মানব সম্পদ উন্নয়ন।




Related Keyword :

সমবায় সমিতির বৈশিষ্ট্য 

সমবায় সমিতির নীতিমালা 

সমবায় সমিতির প্রকারভেদ 

সমবায় সমিতির গঠন

সমবায় সমিতি কি..? 




ধন্যবাদ আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করার জন্য ভালো লাগলে সম্পূর্ণ ওয়েবসাইট ঘুরে দেখুন 






Previous Post Next Post