ব্যবস্থাপনায় হেনরি ফেয়লের অবদান ও নীতিমালা এবং ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার কার্যাবলি কি..?



ব্যবস্থাপনায় হেনরি ফেয়লের অবদান
ব্যবস্থাপনায় হেনরি ফেয়লের অবদান


ব্যবস্থাপনায় হেনরি ফেয়লের অবদান ( Contributions of Henri Fayol in Management ) 


আধুনিক ব্যবস্থাপনার জনক হেনরি ফেয়ল ১৮৪১ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । ১৮৪৭ সালে ৬ বছর বয়সে তিনি মা - বাবার সাথে ফ্রান্সে চলে আসেন । তিনি ১৮৬০ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ফ্রান্সের এস . এ . কমেন্ট্রি ফোরচ্যামবোল্ট ( S. A. Commentry Fourchambault ) এর একটি খনিতে একজন খনি প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন । তাঁর মেধা ও যোগ্যতাবলে ১৮৮৮ সালে উক্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে পদোন্নতি লাভ করেন । তার দক্ষতায় প্রায় দেউলিয়া পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানটি ১৯০০ সালের মধ্যে ফ্রান্সের অন্যতম লাভজনক লৌহ ও ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় । ১৯১৮ সালে তিনি যখন এ দায়িত্ব থেকে অবসর নেন , তখন এ প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে যথেষ্ট সচ্ছল ছিল । ঐ সময় প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় দশ হাজার শ্রমিক কাজ করতো । 



কয়লা খনির শীর্ষ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালনকালে ফেয়ল ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কিছু জটিলতার সম্মুখীন হন । সমস্যাগুলো সমাধানে তিনি গভীর মনোনিবেশ করেন । পরবর্তীতে তাঁর গবেষণালব্ধ জ্ঞানের ভিত্তিতে ব্যবস্থাপন বিষয়ক একটি বিখ্যাত বই রচনা করেন । বইটি ১৯১৬ সালে জেনেভাভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট ' Administration Industrielle et Generale ' নামে ফরাসি ভাষায় প্রকাশ করে । 


আরো পড়ুন:


তাঁর মৃত্যুর ৪ বছর পর ১৯৩০ সালে J. A. Coubrough এটিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন । ১৯৪৯ সালে বইটি আমেরিকায় ' General and Industrial Management ” নামে প্রকাশিত হয় । এরপর বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে । এ সময় ফেয়লের চিন্তাধারার প্রতি অনেকেই আকৃষ্ট হতে থাকেন । কালক্রমে তাঁর ধ্যান - ধারণা সমৃদ্ধ বইটি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক অন্যতম সেরা ক্ল্যাসিক বই হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে । ১৯২৫ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে খ্যাতিমান এ ব্যক্তি ৮৪ বছর বয়সে মারা যান । কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো , তিনি আধুনিক ব্যবস্থাপনার জনক ’ ও ‘ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জনক ' হিসেবে তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি জেনে যেতে পারেননি । 




তিনি ব্যবস্থাপনার নীতিমালা , পদ্ধতি , কার্যাবলি প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে রূপরেখা প্রণয়ন করেন । তিনি তাঁর গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে কাজে প্রয়োগ করেন এবং লেখনীর মাধ্যমেও তুলে ধরেন । তিনি কর্মক্ষেত্র থেকে অবসরগ্রহণের পর গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান গঠন , বিভিন্ন পদ্ধতি ও তত্ত্বের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে তা তুলে ধরতে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন । কর্মময় জীবনের অধিকারী এ খ্যাতিমান ব্যক্তির অবদান নিচে আলোচনা করা হলো 




ব্যবস্থাপনাকে শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা ( Establishing management as a subject ) : দর্শন , ভূগোল , রাষ্ট্রবিজ্ঞান , অর্থনীতি প্রভৃতি বিষয়ের মতো ব্যবস্থাপনাও যে স্বতন্ত্র একটি শাস্ত্র বা বিষয় , এ ব্যাপারটি ফেয়ল সর্বপ্রথম সবার সামনে তুলে ধরেন । তিনি সর্বপ্রথম ধারণা দেন যে , অন্যান্য শাস্ত্রের মতো এটিকেও পাঠ্যবিষয় হিসেবে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব । এজন্য তিনি ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি , মূলনীতি , দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন ।




ব্যবস্থাপনাকে সর্বজনীন প্রয়োগযোগ্য বিষয় হিসেবে চিহ্নিতকরণ ( Identifying management as universally applicable subject ) : 


ফেয়ল ব্যবস্থাপনাকে একটি সর্বজনীন প্রয়োগযোগ্য বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন । তার মতে , গৃহস্থালি থেকে শুরু করে সামাজিক , ধর্মীয় , রাষ্ট্রীয়সহ সব প্রতিষ্ঠানে এ শাস্ত্রের জ্ঞান প্রয়োগ সম্ভব । তিনি মনে করেন , এ শাস্ত্র অধ্যয়ন করে সকলেই উপকৃত হতে পারে । ২,৫০০ বছর পূর্বে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস ব্যবস্থাপনাকে সর্বজনীনতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছিলেন । ফেয়ল তাঁর লেখনীর মাধ্যমে সেই বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন । 



শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাজ নির্দিষ্টকরণ ( Specifying the functions of Industrial organization ) : শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাজ কী হতে পারে তা তিনি নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করেছেন । তিনি শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাজকে ছয়টি স্বতন্ত্র অংশে ভাগ করার কথা বলেছেন । এছাড়া , উক্ত বিভাগের দায়িত্ব ও কর্তব্য কী হতে পারে তারও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন । তাঁর মতে , শিল্প প্রতিষ্ঠানের অপরিহার্য কাজগুলো হলো :


1. কারিগরি কার্যাবলি ( উৎপাদন , নির্মাণ , সংযোজন উপযোগীকরণ )। 

2. বাণিজ্যিক কার্যাবলি ( ক্রয় , বিক্রয় , বিনিময় ) 

3. আর্থিক কার্যাবলি ( মূলধন অনুসন্ধান ও এর কামা ব্যবহার )। 

4. নিরাপত্তা সংক্রান্ত কার্যাবলি ( সম্পত্তি ও মানবসম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ ও কল্যাণসাধন )। 

5. হিসাবরক্ষণ সংক্রান্ত কার্যাবলি ( জমা - খরচ ,। পরিসংখ্যান , মূল্য নির্ধারণ। 

6. ব্যবস্থাপকীয় কার্যাবলি ( পূর্বানুমান ও পরিকল্পনা , সংগঠিতকরণ , আদেশদান , সমন্বয়সাধন এবং নিয়ন্ত্রণ ) । 



ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার কার্যাবলি নির্দিষ্টকরণ ( Specifying the functions of management process ) : ব্যবস্থাপনার কাজ কয়টি ও কী কী এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ের ব্যবস্থাপনা বিশারদগণ অনেক চিন্তা - গবেষণা করেছেন । তবে , সর্বপ্রথম হেনরি ফেয়ল ব্যবস্থাপনার পাঁচটি কাজ নির্দিষ্ট করেন । এগুলো এখন পর্যন্ত ব্যবস্থাপনার মৌলিক কাজ হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে । ব্যবস্থাপনা কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন , To manage is to forecast and plan , to organize , to command , to coordinate and to control . ' অর্থাৎ , ' ব্যবস্থাপনা হলো পূর্বানুমান ও পরিকল্পনা , সংগঠিতকরণ , আদেশদান , সমন্বয়সাধন ও নিয়ন্ত্রণ । ' এজন্য হেনরি ফেয়লকে ' কার্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনার জনক ’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয় । 


আরো পড়ুন :


ব্যবস্থাপনার নীতিমালা প্রণয়ন ( Formulating principles of management ) : 


নীতি বলতে মৌলিক কিছু সত্য বা বিবৃতিকে বোঝায় , যার দ্বারা দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় । প্রতিটি কাজে কিছু মূলনীতি থাকে , যার আলোকে উত্ত বিষয়ে চিন্তা - ভাবনা করা হয় ও দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় । ফেয়ল সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই ব্যবস্থাপনার ১৪ টি মূলনীতি উপস্থাপন করেছেন । সেই নীতিগুলো আজও ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষিত সত্য এবং প্রয়োগযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে । নিচে তাঁর উল্লিখিত মূলনীতিগুলো তুলে ধরা হলোঃ-


1. কার্যবিভাজন 

2. ন্যায্য পারিশ্রমিক 

3. কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের সমতা 

4. নিয়মানুবর্তিতা 

5. আদেশের ঐক্য 

6. নির্দেশনার ঐক্য

7. সাধারণ স্বার্থে ব্যক্তিস্বার্থ বিসর্জন  

8. শৃঙ্খলা 

9. কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ 

10. জোড়া মই শিকল 

11. সাম্য 

12. চাকরির স্থায়িত্ব 

13. উদ্যোগ 

14. একতাই বল 



প্রতিটি কাজে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সম্পর্কে আলোকপাত ( Focus on the responsibility of management to each function ) : 


হেনরি ফেয়ল ব্যবস্থাপনার শুধু কাজই নির্দিষ্ট করেননি বরং এসব কাজে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন । তিনি একজন সংগঠক বা ব্যবস্থাপকের ১৬ ধরনের ব্যবস্থাপনাগত দায়িত্বের কথা বলেছেন , যা নিম্নরূপঃ—


• দক্ষতার সাথে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন করা। 

• প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য , সম্পদ ও চাহিদার সাথে নিয়োজিত জনশক্তি ও উপকরণের মিল যাচাই করা। 

• একক , দক্ষ ও শক্তিশালী কর্তৃত্ব কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। 

• বিভিন্ন কাজ এবং প্রচেষ্টার মধ্যে সমন্বয়সাধন করা। স্পষ্ট এবং যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া। 

• দক্ষ কর্মী নির্বাচন এবং সঠিক স্থানে তাদের নিয়োগ দেওয়া। 

• দায়িত্ব ও কর্তব্য স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা।

• উদ্যোগ গ্রহণ এবং দায়িত্ব পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে উৎসাহিত করা। 

• ন্যায়সংগত ও উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেওয়া। 

• দোষ - ত্রুটির বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া।  

• শৃঙ্খলা রক্ষিত হচ্ছে কি না , তা যাচাই করা। 

• সাধারণ স্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। 

• আদেশের ঐক্যের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া। 

• বৈষয়িক এবং মানবিক এ দুধরনের আদেশই তত্ত্বাবধান করা। 

• প্রত্যেক কাজকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং 

• লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমানো ।




ব্যবস্থাপকীয় গুণ সম্পর্কে দিকনিদের্শনা ( Indicating the managerial quality ) : হেনরি ফেয়ল ব্যবস্থাপকদের কাজ ও দায়িত্ব ছাড়াও তাদের যোগ্যতা ও জ্ঞান সম্পর্কেও দিকনিদের্শনা দিয়েছেন । তিনি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকীর কার্যাবলির গুরুত্ব অনুধাবন করে উক্ত কাজে নিচের ছয়টি বিষয়ের যোগ্যতা ও জ্ঞান থাকার প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেনঃ- 



1. শারীরিক সামর্থ্য ( সুস্বাস্থ্য , দৈহিক শক্তি , নৈপুণ্য প্রভৃতি )। 

2. মানসিক সামর্থ্য ( জ্ঞানার্জন , উপলব্ধি , বিচার , ধৈর্য্য , পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানো প্রভৃতি )। 

3. নৈতিক গুণাবলি ( দৃঢ়তা , দায়িত্ব গ্রহণের ইচ্ছা , অন্যদের সম্মান প্রদর্শন , আনুগত্য , মহত্ত্ব প্রভৃতি )  

4. শিক্ষাগত যোগ্যতা ( কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে সাধারণ শিক্ষা )।  

5. কারিগরি জ্ঞান ( কাজের জটিলতা সম্পর্কিত স্বতন্ত্র জ্ঞান ) এবং

6. অভিজ্ঞতা ( সঠিক উপায়ে কাজ সম্পাদনের বাস্তব জ্ঞান ) । 


গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান গঠন ( Establishing research organization ) : হেনরি ফেয়ল তাঁর প্রশাসনিক তত্ত্ব উন্নত ও জনপ্রিয় করার জন্য দুটি বিশেষ কাজ করেন । কাজ দুটি নিচে দেওয়া হলো : 


১। প্রশাসনিক শিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা : তিনি ' Centre for Administrative Studies ( CAS ) ' প্রতিষ্ঠা করেন । এখানে তিনি লেখক , দার্শনিক , প্রকৌশলী , শিল্পপতিসহ বিভিন্ন পেশার লোকদের নিয়ে নিয়মিত সভার ব্যবস্থা করতেন । 


২। তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগের ব্যবস্থা করা : তাঁর প্রণীত নীতিমালা অনুসরণের জন্য ফ্রান্সের সরকারকে তিনি উৎসাহিত করেন । ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রাসেল্‌সে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি প্রশাসনিক বিজ্ঞানের ওপর গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন । এছাড়া ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘের অধিবেশনে তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রশাসনিক তত্ত্বের গুরুত্বের ওপর বক্তব্য দেন । 



আধুনিক ব্যবস্থাপনার রূপকার হিসেবে হেনরি ফেয়লের অবদান ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত । শতবর্ষ পরেও আধুনিক শিল্প প্রতিষ্ঠানে তাঁর উন্নয়নের চিন্তাধারার নীতি ও পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে । এ কারণেই হেনরি ফেয়লকে ' আধুনিক ব্যবস্থাপনার জনক ' বলা হয় ।



Related Keyword: 

হেনরি ফেয়লের মতে ব্যবস্থাপনা কি..? 

হেনরি ফেয়ল এর অবদান

শিক্ষা ব্যবস্থাপনার নীতি

হেনরি ফেয়লের বিখ্যাত গ্রন্থ

হেনরি ফেয়ল এর ব্যবস্থাপনার নীতি




ধন্যবাদ আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করার জন্য ✅





Previous Post Next Post