বাংলাদেশে ব্যাংক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ বিধান (Controlling Mechanism of Banking System in Bangladesh) : 



বাংলাদেশ ব্যাংক হচ্ছে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক । দেশে ব্যাংক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার এবং তার পক্ষে এ ব্যাংক বিভিন্ন বিধান , প্রবিধান , নিয়ম ইত্যাদি প্রবর্তন করে । ব্যাংক কোম্পানি আইন -১৯৯১ অনুযায়ী এ ব্যাংক ব্যবস্থা গঠন , উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রিত হয় ।


ব্যাংক কোম্পানি আইন , ১৯৯১ ( Bank Company Act - 1991 ) বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিচালনার স্বার্থে সরকার ১৯৯১ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন পাস করে । এই আইন বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবসায় পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা রাখে ।

এই আইনের বিভিন্ন ধারার অন্তর্ভুক্ত বিষয়সমূহ নিম্নরূপ :

১। ব্যাংক কোম্পানির ব্যবসায় বা কার্যাবলি।
২। ব্যাংক কোম্পানি কর্তৃক কতিপয় নিষিদ্ধ ব্যাংকিং ব্যবসায়। ৩। ব্যাংক কোম্পানির লাইসেন্স সংক্রান্ত বিধি - বিধান। 
৪। ব্যাংক কোম্পানিকে প্রদত্ত লাইসেন্স বাতিল সংক্রান্ত বিধি        বিধান
৫। ব্যাংক কোম্পানির ন্যূনতম আদায়কৃত মূলধন ও সংরক্ষিত     মূলধন সম্পর্কিত আইনের বিধান।
৬। ব্যাংক কোম্পানির সংরক্ষিত তহবিল সম্পর্কিত বিধান
৭। ব্যাংক কোম্পানির সংরক্ষিত নগদ তহবিল সম্পর্কিত
    আইনের বিধান।
৮। ঋণ ও অগ্রিম প্রদানের ওপর বাধা - নিষেধ
৯। খেলাপি ঋণগ্রহীতার তালিকা প্রেরণ সম্পর্কিত বিধান
১০। ঋণ মওকুফের ওপর বাধা - নিষেধ।
১১। অগ্রিম প্রদান নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা
১২।  নতুন পরিচালক নির্বাচন সম্পর্কে আইনের বিধান
১৩। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদ পূরণ।
১৪। পরিচালক পদের মেয়াদ।
১৫। পরিচালক পদে শূন্যতা।
১৬। পরিচালক কর্তৃক গৃহীত সুযোগ - সুবিধা সম্পর্কিত
         বিধান।
১৭।  সাধারণ পরিচালক নিয়োগে বাধা - নিষেধ।
১৮। ব্যাংক কোম্পানির হিসাব , ব্যালেন্স সিট , বিবরণী ও
        প্রতিবেদন সম্পর্কিত বিধানসমূহ।
১৯। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ব্যাংক কোম্পানি ও তার খাতা -
      পত্র এবং হিসাব পরিদর্শন এবং তদন্ত সম্পর্কিত বিধান।
২০। ব্যাংক কোম্পানির পরিচালক ইত্যাদি অপসারণের
       ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা।
২১। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ব্যাংক কোম্পানির পরিচালক
       পর্ষদ বাতিল করার ক্ষমতা।
২২। সরকার কর্তৃক ব্যাংক কোম্পানির প্রতিষ্ঠানসমূহ
        অধিগ্রহণ।
২৩। হাইকোর্ট কর্তৃক সাময়িকভাবে ব্যাংক ব্যবসায় বন্ধ
        রাখার বিধি - বিধান।
২৪। হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ব্যাংক কোম্পানির অবসায়ন
       সংক্রান্ত বিধান ।

উল্লিখিত বিষয়গুলোর কোনো একটি নির্দেশ পালনে কোনো ব্যাংক ব্যর্থ হলে , বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ উক্ত ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিতে পারবে । উক্ত ব্যাংক অনুরূপ নির্দেশ , বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত শর্ত সাপেক্ষে পালন করতে বাধ্য থাকবে ।




ব্যাসেল সম্মতি ( Basel Accord ) বিশ্বের ধনী দেশগুলোর মধ্যে ১৯৪৪ সালে বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রেটন উডস্ চুক্তি ( Bretton woods agreement ) নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । এই চুক্তির আওতায় দেশগুলো একটি স্থির বিনিময় হার অনুসরণ করতে সম্মত হয় । এ চুক্তি সম্পাদনের পর থেকে বিভিন্ন দেশের মধ্যে স্থির বিনিময় হার অনুসরণ করতে অসুবিধার সৃষ্টি হয় । ফলে ১৯৭৩ সালে ' ব্রেটন উডস্ চুক্তি ' অকার্যকর প্রমাণিত হয় । স্থির বিনিময় হার পদ্ধতি প্রত্যাহার হলে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার হ্রাস - বৃদ্ধি দেখা দেয় । এতে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় । এরই ধারাবাহিকতায়

গ্রুপ -১০ ( G - 10 ) এর দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের নিয়ে ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে Banking regulations & Supervisory practices নামে একটি কমিটি গঠিত হয় । পরবর্তীতে এ কমিটির নাম পরিবর্তন করে
(Based committee on Banking Supervision) করা হয় । এ কমিটি Bank for International Settlemen ( BIS ) এর আওতায় কাজ করে । বিশ্বব্যাপী ব্যাংক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করাই এ কমিটির প্রধান লক্ষ্য ।

১৯৮৮ সালে ব্যাসেল কমিটি তাদের প্রথম সুপারিশসমূহ তুলে ধরে যা ব্যাসেল -১ নামে পরিচিত । ২০০৪ সালে ব্যাসেল ১ এ পরিবর্তন আনা হয় যা ব্যাসেল -২ নামে পরিচিত । এবং ২০১০-১১ সালে একে আরও আধুনিকায়ন করে ব্যাসেল -৩ এ প্রণয়ন করা হয় । বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাসেল -২ এর নীতিমালা অনুসরণ করা হয় ।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকির পরিমাণ ও মূলধন বিভাজনের জন্য সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বিধি - বিধান তৈরি ও তা উপস্থাপনের লক্ষ্যে ব্যাসেল -২ কমিটি প্রতিষ্ঠা করা হয় । উন্নত দেশের এটিকে আন্তর্জাতিক স্মারক বাজার বিশ্লেষণ করে ব্যাসেল -২ কমিটি তিনটি ভিত্তি  (Pillar) - এর সমন্বয়ে ব্যাসেল -২ প্রণয়ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

ব্যাসেল - ২ - এর ভিত্তিসমূহ ব্যাখ্যা হলো :

ন্যূনতম মূলধনের প্রয়োজনীয়তা ( Minimum capital requirement ) :  ব্যাংক ব্যবসায়ে কী পরিমাণ মূলধন প্রয়োজন এবং কী পরিমাণ মূলধন না হলে তারল্য ও অগ্রিমের ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে না , তা প্রথম ভিত্তি দ্বারা নির্ধারিত হয়ে থাকে ।

তত্ত্বাবধায়ক পর্যালোচনা ( Supervisory review ) : ব্যাসেল -২ ঝুঁকির বিপরীতে ব্যাংকের মূলধনের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করে । ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য দ্বিতীয় ভিত্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।

বাজার শৃঙ্খলা ( Market discipline ) :
প্রতিটি ব্যবসায়ের মতো ব্যাংক ব্যবসায় বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । ব্যাসেল - ২ - এর সহায়তায় সঠিক বাজার শৃঙ্খলার মাধ্যমে ব্যাংকের মূলধন , সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণের প্রক্রিয়া , মূলধনের পর্যাপ্ততাসহ বিভিন্ন তথ্য আদান - প্রদান করা হয় । বাজারে বিদ্যমান অন্যান্য ব্যাংকের সাথে এসব বিষয়ের তুলনামূলক বিচার - বিশ্লেষণ করে সঠিকভাবে ব্যাংকটির মূলধন নিশ্চিত করা হয় ।

বাংলাদেশ ব্যাংক ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন সম্পর্কে ব্যাংক কোম্পানি আইন - ১৯৯১ - এর ধারা ১৩ ও ৪৫ অনুযায়ী একটি গাইডলাইন ইস্যু করে । বাংলাদেশ ব্যাংক , ব্যাংকিং শিল্পের বর্তমান জটিলতা ও বৈচিত্র্যতা বিবেচনা করে ব্যাংকের মূলধনকে বেশি ঝুঁকি সংবেদনশীল ও ঘাতপ্রতিরোধী করে তুলতে এ গাইডলাইন প্রকাশ করে । বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত সব ব্যাংকের জন্য ১ জানুয়ারি , ২০১০ থেকে উক্ত গাইডলাইন অনুসরণ বাধ্যতামূলক করে ।

উক্ত গাইডলাইন ' Basel Committee on Banking Supervision ( BCBS ) কর্তৃক প্রকাশিত ' International Convergence of Capital Measurement : A revised framework of June 2006 ( Basel II Capital Adequacy Framework নামে অধিক পরিচিত ) অনুযায়ী প্রস্তুত করা হয় । এ গাইডলাইন ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক পর্যাপ্ত মূলধনের গাইডলাইন হিসেবে পরিচিত ।

এই গাইডলাইনটি নিম্নবর্ণিত ৩ টি ধারণার ওপর প্রস্তুত করা হয়:

ক . ব্যাংকের ঋণ , বাজার ও পরিচালন ঝুঁকির বিপরীতে
      সর্বনিম্ন মূলধন সংরক্ষণ করা প্রয়োজন ।
খ . পর্যাপ্ত মূলধন নির্ধারণের প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের ঝুঁকি
     তথ্যাদিসহ এর মূলধন বাড়ার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকতে
      হবে ।
গ . ব্যাংকের ঝুঁকির তথ্যাদি , মূলধনের পর্যাপ্ততা এবং ঝুঁকি
    ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি জনসাধারণের কাছে প্রকাশের
     কাঠামো নির্ধারিত হতে হয় ।

ব্যাসেল ২ অনুসরণকারী দেশ :  ( যেমন- বেলজিয়াম , কানাডা , ফ্রান্স , জার্মানি , ইতালি , জাপান , লুক্সেমবার্গ , নেদারল্যান্ডস , সুইজারল্যান্ড , যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র ) ব্যাংক ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী উন্নয়ন সাধিত হয় । বাংলাদেশ এ সমঝোতা স্মারকে অংশগ্রহণ না করলেও ব্যাংকিং ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাসেল - ২ - এর দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে ।
এরূপ নির্দেশনা অনুসরণ করার মাধ্যমে ব্যাংকিং ঝুঁকি মোকাবিলা করে একটি উন্নত ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা সম্ভব হবে ।

গ্রুপ -১০ এর সদস্য সংখ্যা ১১ টি । যথা : বেলজিয়াম , কানাডা , ফ্রান্স , জার্মানি , ইতালি , জাপান , নেদারল্যান্ডস , সুইডেন , যুক্তরাজ্য , যুক্তরাষ্ট্র , সুইজারল্যান্ড । 
১৯৬৪ সালে সুইজারল্যান্ড গ্রুপ -১০ এ যোগদান করে ।

  ধন্যবাদ আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করার জন্য 
Previous Post Next Post